মতিঝিল টু মোহাম্মদপুরঃ এ ট্রাজেডি

‘লং ওয়াক টু ফ্রিডম’(নেলসন ম্যান্ডেলা), ‘অ্যা প্যাসেজ টু ইন্ডিয়া’(ই. এম. ফর্স্টার) এর মত যতগুলো ওয়ে বা প্যাসেজ আছে, তার সাথে ‘মতিঝিল টু মোহাম্মদপুর’ এর কোন মিল নেই। যদি কোন সহৃদয় ব্যক্তি নিজের মূল্যবান সময় ব্যয় করে কোন মিল খুঁজে পান, তাহলে বুঝতে হবে যে, কোথাও নিশ্চয়ই ‘ঘাপলা আছে’। মানে হতে পারে, তার মস্তিস্কের নিউরন সেলগুলোতে গিট্টু লেগে গেছে। যেহেতু গিট্টু ছাড়াবার কোন টেন্ডার প্রক্রিয়ায় সনাতন দা অংশগ্রহণ করেন নাই, সেহেতু তাকে ক্ষমা করে দেয়া যেতে পারে।

সন্ধ্যা সাতটা।‘মতিঝিল টু মোহাম্মদপুর’ উপন্যাসের কেন্দ্রিয় চরিত্র সনাতন দা অফিসের বাস মিস করেছেন। সিটি সেন্টারের সামনে তীর্থের কাকের ন্যায় তার পা দুটো দাঁড়িয়ে আছে বাস ধরার অপেক্ষায়। শাপলা চত্বর থেকে সিটি সেন্টার পর্যন্ত গাড়ির গতিহীন স্তব্ধ মিছিল। ট্রাফিক পুলিশের হাতে থাকা ডান্ডার ভয়ে ঠাণ্ডা হয়ে রয়েছে। ডিম পাড়ার সময় মুরগি যেমন উঁকি-ঝুঁকি মারে ঠিক তেমনি অতি উৎসাহী কেউ কেউ গাড়ির জানালার ফাঁক গলে ইতিউতি তাকাচ্ছে। যেদিকেই তাকায় শুধু গাড়ি আর গাড়ি। গাড়ির মচ্ছব।দাদা গাড়ি, বাবা গাড়ি, ছেলে গাড়ি। গাড়ির ফোর্টিন্থ জেনারেশন। হরেক রকমের গাড়ি- রাস্তায় গড়াগড়ি। 
হঠাৎ করেই ট্রাফিক পুলিশের হ্যান্ড সিগনাল- মুভ।
সনাতন দা’র পা দুটো তাকে নিয়ে বাসে উঠে পড়ল। চোখের পলক ফেলার আগেই তিনি মোহাম্মদপুর পৌছে গেলেন। একি সত্যি! একি অবিশ্বাস্য!
হ্যাঁ, সত্যি।
তবে এই পলকটা ফেলতে সময় লেগেছিল সাড়ে তিন ঘণ্টার মত। এই সময়টাতে সনাতন দা শেষ করেছেন এনটিভিতে প্রচারিত সিরিয়াল ‘সম্রাট’ এর দশটি পর্ব এবং একটি রোমান্টিক মুভির অর্ধাংশ। মাঝে বউ ফোন করে জিজ্ঞাসা করল-
‘আর কত দেরি হবে? বাজার করতে হবে!’
‘মাত্র সিটি কলেজের সামনে।’
‘তুমি বরং মতিঝিল ফিরে যাও। কালকের অফিস করে একবারে এসো।’
‘সত্যিই তাই।’
কথা শেষ করে সনাতন দা ভাবতে বসলেন। ‘দিন না এমন হয়ে দাঁড়ায় যে, বাধ্যতামূলকভাবে বাসের টিকিট কেটে বাধ্যতামূলকভাবে হেঁটে যেতে হবে। টিকিটের ক্যাটাগরি হবে(যেখানেই নামেন)- সিটিং ৩০টাকা, স্ট্যান্ডিং ২০টাকা এবং পায়ে হাঁটা ১০টাকা। এই দশ টাকার টিকিটের লোকটিই আগে পৌছবে।’
‘মতিঝিল থেকে মোহাম্মদপুরের সময়ের দুরত্ব স্বাভাবিক অবস্থায় ত্রিশ থেকে চল্লিশ মিনিট। ললাট লিখন জ্যামের কারনে অতিরিক্ত সময় লাগে গড়ে আড়াই ঘণ্টা। তাহলে এক ওয়ার্কিং সপ্তাহে(৫দিন) সাড়ে বারো ঘণ্টা। এক বছরে ৬৫০ ঘণ্টা। যদি আরও ২৫ বছর কর্মজীবনে থাকি তাহলে হবে ১৬২৫০ ঘন্টা। অর্থাৎ ১.৮৬ বছর। যাক, কর্মজীবন শেষে নাতি-নাতনিদের গর্বের সাথে বলতে পারব যে, আমার কর্মজীবনে ১.৮৬ বছর জ্যামে কাটিয়েছি। বলতে পারব, ১.৮৬ বছর অপদার্থের মত রাস্তায় কাটিয়েছি। বলতে পারব, আমার জীবনের ১.৮৬ বছরের কার্যকারিতা হচ্ছে এ বিগ জিরো।’

‘বিধাতাকে বলতে চাই- আমার আয়ু থেকে ১.৮৬ বছর কেটে রেখে জ্যামবিহীন চলা-ফেরা করতে দাও।’
আপনার টাইমলাইনে শেয়ার করতে ফেসবুক আইকনে ক্লিক করুনঃ
Updated: January 21, 2018 — 7:13 pm

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *