যা ভাবছেন, তা নয়

শীত লাগা সকালে ঘুম ভাঙ্গব ভাঙ্গব বলে যখন ভাঙ্গে না তখন মোবাইলটার সেট অ্যালার্ম বেজে ওঠে ঠিক নয়টায়। এমন বিশ্রি শব্দ সেট করা, ঘুম তো ঘুম, ছয় মাস ধরে ঘুমানো কুম্ভকর্ণও চিৎকার মেরে জেগে উঠবে। যারা আলসে প্রকৃতির অফিসজীবী দুপেয়ে প্রাণী- এছাড়া তাদের উপায় কী! ৮মিনিটের মাথায় ফুলবাবু সেঁজে ওয়াই-ফাইটা কানেক্ট করে পাঠাও এ কল। একটা বাইক দে না, ভাই। একটা বাইক দে। খুঁজছে, খুঁজছে এবং খুঁজছে। অবশেষে পেয়ে গেলাম এক রাইডারকে। কিন্তু-

নাম দেখে ভড়কে গেলাম! দ্বিতীয়বার ভাবার সুযোগ পেলাম না। সময়ের পালে বাতাস লেগেছে। তরতর করে দশটার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কোনভাবেই টেনে ধরা যাচ্ছে না। আমি কল দেয়ার আগেই আমার ফোনটা সাইরেন বাজানো শুরু করে দিয়েছে। অগত্যা মধুসূদন, মাথা নেড়ে দিলাম। সময় যদি একটু সহনীয় মাত্রায় ঘুষ-টুষ খেত- একটা উপায় করা যেত। যেহেতু নেই সেহেতু হাতের লক্ষ্মী পায়ে না ঠেলে কোলে তুলে নিলাম।

 

একটা একটা করে সিড়ি ছেড়ে যাচ্ছি আর ভাবছি এই রাইডারের সাথে যাওয়া কী ঠিক হবে! ভুল করছি না তো! অবশেষে মিটিং প্লেসে চলে এলাম। রাইডার হাজির। নীল জিন্স, সাদা কেডস, মাথায় হেলমেট এবং গায়ে জ্যাকেটসহ, আমার অনুমান, ওজন হবে ৪৮কেজি। নিজের অনুমানবিদ্যার দৌড়ে ভীষণ পুলকিত হয়ে উঠলাম। ‘ললাট লিখন, খণ্ডিয়েছে সে কোন জন’ বলে বাইকের পিছনে আমার ৭০কেজি ওয়েট চাপিয়ে দিলাম। রাইডারের পা দুখানা যেন ভূমিকম্পে কেপে উঠল। মনে মনে বলে উঠলাম, ‘খাইছে আমারে আইজ। বউটার মুখ আর এ জীবনে দেখতে পাব কিনা কে জানে!’
বাইক পুরুষসিংহের ন্যায় গর্জে উঠলো। জড়িয়ে ধরতে গিয়েও ধরলাম না। যদি মাইন্ড করে বসে। যদি ভাবে যে মাত্র সদরঘাটে লঞ্চ থেকে নামলাম। আমার ১৮ বছর ধরে ঢাকা থাকার স্ট্যাটাস নর্দমায় গিয়ে পড়বে। সিটি কর্পোরেশনও মাইন্ড করে বসবে। মাত্র তিন সেকেন্ডে এতসব মহান আইডিয়া মাথায় বসে গিয়ে আমাকে কুঁকড়ে দিল। কাঠ হয়ে বসে থাকলাম।
যা ভেবেছিলাম, তা নয়। রাইডার একটা মাল। অতবড় মোটর বাইক তার উপর আলুর বস্তার মত আমি, যেন কিছুই না। ত্যাজপাতা। বাতাসে উড়ে যাওয়ার মত। রিকশার চাকা ছুই ছুই, কারের কান(লুকিং গ্লাস) ধরি ধরি,  বাসগুলোর চিপা-চাপা দিয়ে, সহযাত্রী রাইডারদের  বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে, জ্যাম ঠেঙিয়ে গুলির বেগে কলেজ গেট টু আসাদ গেট টু কলাবাগান টু সাইন্সল্যাব টু নীলক্ষেত টু ভার্সিটির পেটের মধ্য দিয়ে সেক্রেটারিয়েট। বাইকে বাইকে সয়লাব। একটা জ্যাম। ৯টা ৪০বাজে। ট্রাফিক পুলিশের কানফাটা বাঁশি। যেন হাইড্রলিক হর্ন। কানের পর্দার ভবলীলা সাঙ্গ হওয়ার পথে। স্টেডিয়ামের হৃৎপিন্ড দিয়ে জনতা ভবন।
নামলাম। ভাড়া মেটালাম। বললাম, ‘আপু যদি কিছু মনে না করেন, এককাপ চা খাওয়াতে চাই’। ইতোমধ্যেই ওই রাইডার আপুর আরেকটা কল এসেছে। ‘বলার জন্য ধন্যবাদ, ভাই। দেখছেনই তো অবস্থা। সময়টাকে কাজে লাগাই। আচ্ছা, যাই। আরেকদিন যদি দেখা হয়ে যায়, সেদিন খাব’ বলে হালকা একটা স্টান্ট করে আমাকে পেছনে ফেলে সামনের দিকে চলে গেল। আমি তার অপস্রিয়মান ছায়ার দিকে বেশ কিছুক্ষণ মুগ্ধদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলাম।
বিষ্মিত মুগ্ধতা কেটে যেতেই মনে পড়ল, একদিন শনিবার দেশের বাণিজ্যিক প্রাণকেন্দ্র মতিঝিল প্রায় ফাঁকা। দেখলাম এক বালিকাকে। বকের মত সাদা স্কুলড্রেস পরা। নাইন কী টেনে পড়ে। মাথায় হেলমেট। পনিটেইল করে চুল বাধা। উড়ছে বাতাসে। মুখে দৃঢ়তার ছাপ। স্কুটি চালিয়ে আসছে। দ্রুতগতিসম্পন্ন দুই বাসের মাঝখান দিয়ে দক্ষতার সাথে তার স্কুটিটাকে নিয়ে যেভাবে বেরিয়ে আসলো, আমি পুরাই হতবাক। আমার জীবনে দেখা সুন্দর দৃশ্যগুলোর একটি। আমার ভাললাগা দৃশ্যগুলোর একটি। আগত ভবিষ্যতের বাংলাদেশে এগিয়ে যাওয়ার প্রতিচ্ছবি।
আমি ঠিক করেছি আমার মেয়েটাকেও একটা স্কুটি কিনে দেব।
[এটা আপনাদের সাথে আমার আড্ডাস্থল। এখানে আমি মন খুলে কথা বলি। পোস্টটি শেয়ার করুন, কমেন্টে শেয়ার করুন আপনার সমস্যা। সমাধান পেয়ে যাবেন। পরবর্তী পোস্ট পেতে ‘সনাতন দা’ কে ক্লিক করে ফলো করে রাখতে পারেন।]
আপনার টাইমলাইনে শেয়ার করতে ফেসবুক আইকনে ক্লিক করুনঃ
Updated: March 11, 2018 — 10:45 am

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *