Living in us

Living in Us

শফিক আর দশজনের মত খুবই সাধারণ একজন মধ্যবয়সী দু’পেয়ে জীব। জনাকয়েক সাধু-সন্যাসী ব্যতিরেকে, শফিককে চেনে না এই তল্লাটে এমন কেউ নাই। এমনকি এই ঢাকা শহরে নাই। তার মানে এই নয় যে, শফিক একজন উঁচুদরের লোক। অথবা, শফিকের নামের আগে কিছু ভয়ংকর চরিত্র প্রকাশক বিশেষণ রয়েছে। যেমন- ‘ক্ষুর’, ‘ল্যাংড়া’, বটি ইত্যাদি। যা তার নামের পূর্বে বসে নামটিকে মহিমান্বিত করতে পারে। তবে বোতাম শফিক হতে পারতো। কারণ, পরিচিত হোক আর অপরিচিতই হোক, কারও সাথে দেখা হলে, কথা বলতে বলতে কখন যে সে তার বিপরীতে থাকা ব্যক্তির শার্টের উপরের বোতাম হাপিশ করে দেবে, তা সে নিজেও তা বলতে পারে না। যুবতীদের কামিজ বা শাড়িতে সাধারণত বোতাম থাকে না। তাই রক্ষে! তা না হলে এতদিনে কয়েকশবার শফিকের এফিটাফ লেখা হয়ে যেত।

“এখানে ঘুমিয়ে রয়েছে সেই,

যার কারণে অনেকের শার্টে বোতাম নেই।”

 

সেদিনকার ঘটনা বলি।

রাত তখন নয়টা। শাহবাগ মোড় থেকে রিকসায় করে শফিক যাচ্ছিল মোহাম্মদপুর । ওখানেই ওর বাসা। চারজনের একটা মেস। সিটি কলেজের সামনে দিয়ে পপুলার হাসপাতালের নাকের ডগা দিয়ে সীমান্ত স্কয়ার ক্রস করবে করবে ভাব। সামনে রয়েছে জিগাতলা মোড়ে প্রেমিকার রঁদেভুতে আসার মত জ্যাম। এই ছাড়ে এই ছাড়ে – কিন্তু ছাড়ে না। হঠাৎ করেই সামনের একটা রিকশা ওর দৃষ্টি কেড়ে নিল। ভুল হল। রিকশা নয়, রিক্সার আরোহী। স্ট্রিট ল্যাম্পের সোডিয়াম আলোয় নকশা করা আলো-আঁধারিতে আরোহীর একাকী হাতের বাঁক, কচি কলাপাতা রঙের লম্বা লম্বা আঙুল, মৃদু বাতাসে উড়ন্ত হালকা মেহেদিরাঙা চুল, রিনরিনে কণ্ঠস্বর শফিককে পয়ত্রিশ বছর থেকে নামিয়ে ত্রিশে নিয়ে এল।

আবেশে চোঁখ বুজে এল শফিকের। পিছন থেকেও দেখতে এত সুন্দর হয় মানুষ! ভাবতে ভাবতে বাংলা ছবির দুই-একটা বিশুদ্ধ বৃষ্টিভেজা গানের দৃশ্যায়নও ফুল কমপ্লিট। ঘোরের মাঝে মাত্র ধানমন্ডি লেকে দুজনে পাশাপাশি হাঁটছে, এমন সময় ট্রাফিক পুলিশের সুবুদ্ধির উদয় হল। জ্যাম ছেড়ে গেল। রিক্সার চাকা গন্তব্যের দুরত্ব কমিয়ে নিতে শুরু করল। প্রত্যাশিত রিক্সার কাছাকাছি আসতেই, হঠাৎ করে আরোহী পিছন ফিরল।

ঠাঁশ! ‘ঠীশ’! রিক্সাওয়ালা ব্রেক কষেনি। হাইড্রোলিক ব্রেক করেছে শফিক। ভাবছেন কি টায়ার পাংচারের শব্দ? না, সে শব্দ আরো জোরে হয়। তবে কি চড় মারার শব্দ! হ্যাঁ, ঠিক তাই। চড় মারার শব্দ!

শফিকের ভিতরে যে শফিক ছিল, চড়টা সে খেল। ঠিক ডানগালে। চড়টা আরোহী মারেনি। মেরেছে আরোহীর মুখ। শফিকের স্বপ্নদ্রষ্টা আরোহীর মুখে নাকের ঠিক নিচেই রয়েছে একজোড়া পুরু ঘনকালো গোঁফ!!! পিছন থেকে একপাশ দেখে বোঝাই যায়নি যে, আরোহী যুবতী নয়, যুবক। বড় বড় চুল রাখা, বেনী করা অথবা বাতাসে উড়িয়ে দেয়া একটা ট্রেন্ড। এই ট্রেন্ডেই ধরা খেয়ে গেল আমাদের শফিক। রিক্সা চলছে। কিন্তু শফিকের চিন্তা-চেতনা থম্ মেরে গেছে। বাসায় ফেরা অব্দি আর বোতাম শফিকের থম্ ভাব কাটেনি।

কী আমার কথা সত্য হলো তো! এই শফিক আমাদের মাঝেই বর্তমান। আমরা এই শফিককে সকলেই চিনি।

পূর্ববর্তী গল্প: নতুন চাকরি পেলে কী হয়

আপনার টাইমলাইনে শেয়ার করতে ফেসবুক আইকনে ক্লিক করুনঃ
Updated: May 13, 2018 — 10:09 pm

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *