চর্যাপদ থেকে কতটুকু পড়ব – সাথে প্রশ্ন ও উত্তর

চর্যাপদ থেকে কতটুকু পড়ব : চর্যাপদ খুটে খুটে পড়তে গেলে শেষ হবে না। তাই চর্যাপদ থেকে কতটুকু পড়ব  সে সম্পর্কে ধারণা না থাকলে অকূল পাথারে পড়তে হবে। সনাতন দা’র আজকের পোস্টে চর্যাপদ থেকে কতটুকু পড়ব তা বিস্তারিত আলোচনা করা হল। এর আগে চর্যাপদ থেকে কতটুকু পড়ব তা নিয়ে একটা পোস্ট দিয়েছিলাম। সেটার সাথে মিলিয়ে পড়লে আপনাদের সুবিধা হবে।

চর্যাপদ থেকে কতটুকু পড়ব

চর্যাপদ থেকে কতটুকু পড়ব: প্রাচীন যুগ ও চর্যাপদ : 

প্রাচীন যুগের শুরু নিয়ে বিভিন্ন মতভেদ আছে। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ-র মতে বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন যুগের ব্যপ্তি ছিল ৬৫০খ্রিস্টাব্দ থেকে ১২০০খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। ডক্টর সুনীতিকুমারের মতে এর সময়কাল ৯৫০-১২০০ খ্রিস্টাব্দ।

প্রাচীন যুগে বাংলা ভাষায় রচিত সাহিত্যের একমাত্র ও আদিতম নিদর্শন হল চর্যাপদ। খ্রিষ্টীয় দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে রচিত চর্যাপদাবলি ছিল সহজিয়া বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের সাধনসংগীত বা গানের সংকলন।এর মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল বৌদ্ধ ধর্মের সাধন প্রণালী ও দর্শন তত্ত্ব।আধুনিক ভাষাতাত্ত্বিকগণ বৈজ্ঞানিক তথ্যপ্রমাণের সাহায্যে প্রমাণ করেছেন যে চর্যার ভাষা প্রকৃতপক্ষে হাজার বছর আগের বাংলা ভাষা। সমকালীন বাংলার সামাজিক ও প্রাকৃতিক চিত্র এই পদগুলিতে প্রতিফলিত হয়েছে। এটি আদি যুগের একমাত্র লিখিত নিদর্শন।

চর্যাপদ থেকে কতটুকু পড়ব : আবিষ্কারঃ
১৮৮২ সালে রাজা রাজেদ্র লাল মিত্র “Sanskrit Buddhist Literature in Nepal” গ্রন্থে চর্যাপদের অস্তিত্বের কথা বলেছিলেন। সেই সূত্র ধরে ১৯০৭ খ্রীস্টাব্দে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালের রাজদরবারের “রয়েল লাইব্রেরি”  গ্রন্থশালা থেকে চর্যার একটি খণ্ডিত পুঁথি উদ্ধার করেন। চর্যাপদের সাথে ‘ডাকার্ণব’ এবং ‘দোহাকোষ’ নামে আরো দুটি বই নেপালের রাজ দরবারের গ্রন্থাগার হতে আবিষ্কৃত হয়। সবগুলো বই একসাথে ‘হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধগান এবং দোহা’ নামে প্রকাশ করা হয় ১৯১৬ সালে । পরবর্তীতে ১৯২৩ সালে (বাংলা ১৩২৩ বঙ্গাব্দ) কলকাতার বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে এটি প্রকাশিত হয়। ড. হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালের রাজ দরবারের গ্রন্থাগার হতে ১৯০৭ সালে ‘চর্যাচর্য বিনিশ্চয়’ নামক পুথিটি আবিষ্কার করেন।এটি প্রকাশিত হবার পর পালি সংস্কৃতসহ বিভিন্ন ভাষাবিদগন চর্যাপদকে নিজ নিজ ভাষার আদি নিদর্শন বলে দাবী করেন।

এসব দাবী মিথ্যা প্রমাণ করতে ড. সুনীতি কুমার চট্রোপাধ্যায় ১৯২৬ সালে The Origin and Development of Bengali Language গ্রন্থে চর্যাপদ এর ভাষা বিষয়ক গবেষণা করেন এবং প্রমাণ করেন চর্যাপদ বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন।
১৯২৭ সালে শ্রেষ্ঠ ভাষা বিজ্ঞানী ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ চর্যাপদের ধর্মতত্ব বিষয়ক গবেষণা করেন এবং প্রমাণ করেন যে চর্যাপদ বাংলাসাহিত্যের আদি নিদর্শন।

চর্যাপদ থেকে কতটুকু পড়ব: যা জানতেই হবে

চর্যাপদের মোট পদসংখ্যা ছিল ৫১ টি। ডঃ শহীদুল্লাহ বলেছেন ৫০টি। তবে ৫১টি সর্বজন স্বীকৃত।এক একটি পদ সাধারণত ১০টি লাইন সহযোগে গঠিত।শুধু ২১নং পদে লাইনসংখ্যা ৮টি এবং ৪৩ নং পদে লাইন সংখ্যা ১২টি। চর্যাপদের ৫১টি পদের মধ্যে সাড়ে ছেচল্লিশটি পদ পাওয়া গিয়েছে।বাকি সাড়ে চারটি পদ পাওয়া যায় নি।অনাবিষ্কৃত পদগুলি হল ১১,২৩,২৪,২৫,৪৮।এর মধ্যে ২৩ তম পদের প্রথম ৬টি লাইন পাওয়া গিয়েছে বাকি ৪টি পাওয়া যায় নি। কাহ্নপা-১৩টি, ভুসুকুপা-৮টি, সরহ পা-৪টি, লুই-শান্তি-শবরী এরা ২টি করে, বাকিরা ১টি করে পদ রচনা করেন।তন্ত্রীপা ও লাড়িডোম্বীপার কোন পদ পাওয়া যায়নি। ২৪ নং পদের রচয়িতা কাহ্নপা; ২৫ নং পদের রচয়িতা তন্ত্রীপা।চর্যাপদের প্রথম পদ ”কা আ তরুবর পঞ্চ বি ডাল”। চর্যায় মোট ৬টি প্রবাদ বাক্য পাওয়া যায়। যেমন- “ আপনা মাংসে হরিণা বৈরি”।

চর্যাপদ থেকে কতটুকু পড়ব : চর্যার কবিঃ

আবিষ্কৃত পুঁথিটিতে মোট ২৪ জন সিদ্ধাচার্যের নাম পাওয়া যায়। শহীদুল্লাহর মতে ২৩ জন (Buddist Mystic Songs); সুকুমার সেনের মতে ২৪ জন (বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস)। এঁরা হলেন: লুই, কুক্কুরী, বিরুআ, গুণ্ডরী, চাটিল, ভুসুকু, কাহ্ন, কাম্বলাম্বর, ডোম্বী, শান্তি, মহিত্তা, বীণা, সরহ, শবর, আজদেব, ঢেণ্ঢণ, দারিক, ভাদে, তাড়ক, কঙ্কণ, জঅনন্দি, ধাম, তান্তী, লাড়ীডোম্বী। চর্যার পদকর্তাগণের নামের শেষে সন্মানসূচক পা যোগ করা হয়।

চর্যাপদের আদি কবি বা সিদ্ধাচার্য হিসেবে ধরা হয় লুইপাকে।কিন্তু ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন শবরপা ছিলেন লুইপার গুরু তাই চর্যার প্রাচীন কবি শবরপা-ই হবেন। এই পুঁথিতে লাড়ী ডোম্বীপার কোন পদ পাওয়া যায় নি তাই তাকে চর্যাপদের নামে মাত্র কবি বলা হয়। একমাত্র অনুমিত মহিলা কবি বলা হয় কুক্কুরীপাকে। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, প্রাচীনতম চর্যাকার শবরপা এবং আধুনিকতম চর্যাকার সরহ বা ভুসুকুপা।

চর্যাপদ থেকে কতটুকু পড়ব : যা মনে রাখতে হবে

১।চর্যাপদ রচিত হয় পাল আমলে

২।’চর্যাচর্যবিনিশ্চয়’ নামটি দিয়ে ছিলেন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী। যার অর্থ কোনটি আচরণীয়, আর কোনটি নয়।

৩।হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ও সংস্কৃত বিভাগের প্রতিষ্টাতা চেয়ারম্যান ছিলেন।

৪।চর্যাপদের আবিস্কৃত পদের সংখ্যা সাড়ে ছেচল্লিশটি।চর্যাপদের ১ম পদটির রচয়িতা -আদি কবি লুইপা। রচিত পদের সংখ্যা ২ টি। লুইপা রচিত সংস্কৃতগ্রন্থের নাম পাওয়া যায়: – ৫টি। অভিসময় বিভঙ্গ, বজ্রস্বত্ব সাধন, বুদ্ধোদয়, ভগবদাভসার, তত্ত্ব সভাব।

৫।চর্যাপদের সবচেয়ে বেশি পদ রচনা করেছেন কাহ্নপা। যার অন্য নাম কৃষ্ণাচার্য। চর্যাপদে কাহ্নপার নাম পাওয়া যায়-কাহ্নু, কাহ্নি, কাহ্নিল, কৃষ্ণচর্য,কৃষ্ণবজ্রপাদ। তার রচিত মোট পদের সংখ্যা ১৩ টি । উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে ১২ টি। তার রচিত ২৪ নং পদটি পাওয়া যায়নি।

৬।ভুসুকুপা লিখেছেন ৮টি পদ। পদসংখ্যার রচনার দিক দিয়ে ২য়। তিনি নিজেকে বাঙ্গালী কবি বলে দাবী করেছেন।তার বিখ্যাত কাব্যঃ অপনা মাংসে হরিণা বৈরী অর্থ – হরিণ নিজেই নিজের শত্রু।

৭।চর্যাপদের ২৮ ও ৫০ নং পদের রচয়িতা শবরপা। চর্যাপদের শ্রেষ্ঠ কবি শবর পা (লুইপার গুরু)। রচিত পদের সংখ্যা ২ টি।গবেষকগণ তাকে বাঙ্গালী কবি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।চর্যার কবিদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা প্রাচীন বলে মনে করা হয় শবরপাকে (৬৮০ থেকে ৭৬০ খ্রিস্টাব্দ)।

৮।হরপ্রসাদ শাস্ত্রী চর্যাপদের ভাষার নাম দিয়েছেন ‘সন্ধ্যা ভাষা ‘বা ‘আধারী ভাষা।

৯।চর্যাপদের ভাষা বাংলা প্রমাণ করেন – ড.সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়।

১০।আধুনিক ছন্দ বিচারে চর্যাপদ কোন চন্দে রচিত – মাত্রাবৃত্ত ছন্দ।

১১। চর্যাপদে ৫ টি ভাষার মিশ্রণ রয়েছে-বাংলা,হিন্দি,মৈথিলি,অসমিয়া, উড়িয়া।

১২।চর্যাপদের ইংরেজি অনুবাদ ‘মিস্টিক পোয়েট্রি অব বাংলাদেশ’।

১৩।বাংলা সাহিত্যের/গানের/কবিতার আদি নিদর্শন কি? উ: চর্যাপদ।

১৪।চর্যাপদ এক প্রকার- গান ও কবিতা।

১৫।চর্যা শব্দের অর্থ – আচরণ।

১৬।চর্যাপদের অন্য নাম – চর্যাগীতিকোষ বা দোহাকোষ। চর্যাপদের নাম নিয়ে প্রস্তাবগুলো -কারো মতে গ্রন্থটির নাম, ‘আশ্চর্যচর্যাচয়’, সুকুমার সেনের মতে ‘চর্যাশ্চর্যবিনিশ্চয়, আধুনিক পন্ডিতদের মতে এর নাম ‘চর্যাগীতিকোষ’ আর হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতে ‘চর্য্যার্চয্যবিনিশ্চয়’। তবে ‘চর্যাপদ’ সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নাম।

১৭।চর্যাপদের প্রতিপাদ্য বিষয় – বৌদ্ধ সহজিয়াদের সাধন সঙ্গীত।

১৮।শহীদুল্লাহর মতে চর্যাপদ রচিত হয় – ৬৫০-১২০০ খ্রীঃ;

১৯।সুনীতিকুমারের মতে চর্যাপদ রচিত হয় – ৯৫০-১২০০ খ্রীঃ

২০।চর্যাপদের বয়স আনুমানিক – ১০০০ বছর।

২১।নেপালের রাজগ্রন্থাগারে চর্যাপদের সাথে প্রাপ্ত বইয়ের নাম – ডাকার্ণব ও দোহাকোষ

২২।ডাকার্ণব ও দোহাকোষ কোন ভাষায় লেখা – অর্বাচীন অপভ্রংশ।

২৩।চর্যাপদের প্রথম পদ – “কাআ তরুবর পাঞ্চ বি ডাল/চঞ্চল চীএ পৈঠা কাল”।

২৪।চর্যাপদের অনুমিত মহিলা কবি – কুক্কুরী পা।

২৫।চর্যাপদের বাঙালি কবি – শবর পা, লুইপা, ভুসুকু পা, জয়ানন্দ।

২৬।চর্যাপদের প্রথম বাঙালি কবি – মীননাথ/মাৎসেন্দ্রনাথ।তাঁর কোন পূর্ণাঙ্গ পদ পাওয়া যায়নি।

২৭।চর্যাপদের আধুনিক্ পদকর্তা – সরহপা>ভুসুকুপা।

২৮।চর্যাপদের ভাষা – প্রাচীন বাংলা।

২৯।শহীদুল্লাহর মতে চর্যাপদের ভাষা – বঙ্গকামরূপী।

৩০।চর্যাপদের ভাষা বাংলা-কে প্রমাণ করেন – সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়।

৩১।সুনীতিকুমারের মতে চর্যাপদের ভাষায় কোন অঞ্চলের ভাষার নমুনা পরিলক্ষিত হয় – পশ্চিম বাংলার প্রাচীন কথ্য ভাষা।

৩২।চর্যাপদের ভাষা কে আলো আধারি ভাষা বলেছেন – হরপ্রসাদ শাস্ত্রী

৩৩।চর্যাপদের ভাষা হল প্রচ্ছন্ন ভাষা- বলেছেন – ম্যাক্স মুলার।

৩৪।চর্যাপদ কোন ছন্দে লেখা – গোপাল হালদারের মতে মাত্রাবৃত্ত ছন্দে।

৩৫।চর্যাপদের বেশিরভাগ পদ কত চরণে রচিত – ১০ চরণ।

৩৬।চর্যাপদের পদগুলো টীকার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেন – মুনিদত্ত।

৩৭।মুনিদত্ত কোন পদটি ব্যাখ্যা করেন নি – ১১ নং পদ।

৩৮।চর্যাপদের সহোদর ভাষা কি কি – অসমিয়া ও উড়িয়া।

৩৯।চর্যাপদের ভাষায় প্রভাব রয়েছে কোন কোন ভাষার – হিন্দি, অপভ্রংশ (মৈথিলী), অসমিয়া, উড়িয়া।

৪০।সর্বপ্রথম চর্যাপদের ভাষা নিয়ে আলোচনা করেন – বিজয়চন্দ্র মজুমদার (১৯২০)।

৪১।চর্যাপদের ভাষাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য আলোচনা করেন – সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় (১৯২৬)

৪২।চর্যাপদের ধর্মমত সম্পর্কে প্রথম আলোচনা করেন – শহীদুল্লাহ (১৯২৭)।

৪৩।চর্যাগীতির অন্তর্নিহিত তত্ত্বের ব্যাখ্যা প্রকাশ করেন – শশিভূষণ দাশগুপ্ত (১৯৪৬)।

৪৪।চর্যাপদের তিব্বতীয় অনুবাদ প্রকাশ করেন – প্রবোধচন্দ্র বাগচি

আপনার টাইমলাইনে শেয়ার করতে ফেসবুক আইকনে ক্লিক করুনঃ
Updated: May 8, 2020 — 8:40 pm

1 Comment

Add a Comment
  1. Apni amader jonno eto kichu korben r ami amr jonno porte parbo na.eta hote pare na.thank u sir .

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *